দীপক রায়







ওরা আমায় খেলায় নেবে না 

ওরা যখন খেলায় নেবে না বলল 
আমি তখন মাঠ খুঁজতে বেরোলাম 

কত মাঠই তো ছিল 
    এপার থেকে ওপার
গড়ের মাঠ থেকে গোরস্থান
ভুবনডাঙ্গা থেকে চণ্ডিতলা
টেনিস গ্রাউন্ড থেকে গোর্খা গ্রাউন্ড
শিমুলতলা থেকে ভূশুণ্ডীর মাঠ 

ছোটো ছোটো খেলা শুরু হয়েছে
ওলাবিবিতলা এসে মনে হল 
ওরা আমায় নেবে।

আলো কমে এল। সন্ধ্যা নামছে।
অন্ধকারে খুঁজে পাচ্ছি না মাঠ।
মাথার ওপর দিয়ে আলো জ্বেলে জ্বেলে উড়ে যাচ্ছে একটা বিমান

ওরা আমায় খেলায় নেবে না বলল 


গৌতম চৌধুরী







দোষে গুণে মুদ্রাও ইশারা


ধরেন, কিছু তস্করকে ছাড়িয়া দেওয়া হইল প্রহরীহীন এক নক্ষত্রবীথিতে সেখানে তাহারা মনের আনন্দে পরপর কয়টি ব্যাঙ্কডাকাতি করিল তাহার পর সেই মহাজাগতিক মুদ্রার বস্তা লইয়া তাহারা করিবে কী! আমরা এইরূপ কোনও কাহিনির ভিতরে নাই দিন আনি দিন খাই অনেকে আনেও না, খায়ও না তাহারা প্রসঙ্গের বাহিরে অজলচল এই শব্দের কোনও তরজমা সম্ভবে না কে আর বল্লালী টীকা ঘাঁটিতে যাইবে? নাম কি কোনও অনুষঙ্গ বহিয়া আনে? কণিষ্ক বলিলে আনে পটল বলিলে নয় পটল ছিল এক বালিকা, তাহার বাবা বাস চালাইতেন আপনারা কেহ চিনেন না...

...

যেন বা ভূগর্ভের গহ্বর হইতে উঠিয়া আসিতেছে ঘোড়সওয়ারের দল তাহাদের ছায়ামাত্র দেখা যাইতেছে কোথায় ছিল উহারা! এই প্রশ্ন, এই বিস্ময়, অবান্তর হইয়া গিয়াছে এক জমকালো  জমায়েতে পিছনে অস্তায়মান সূর্য অদৃশ্য হইতে উঠিয়া আসিয়া তাহারা কাতার দিয়া দাঁড়াইতেছে তাহাদের হাতের লাগাম দৃঢ়ভাবে ধরা ঘোড়াগুলি ইশারামাত্র ছুটিয়া যাইবে অভিপ্রেত দিকে রক্তাভা মিশ্রিত সোনালি আলোয় ঝলমল করিতেছে পটভূমি গভীর কৃষ্ণবর্ণের মূর্তিগুলির অসি ঝলমল করিয়া উঠিল দশদিক প্লাবিত করিয়া তাহারা উড়িয়া চলিয়া গেল দিগন্তের দিকে...

...

দর্শক না-রহিলে আর দৃশ্যের অর্থ কী! তবু, কোনও রচনাই মুলতুবি থাকে না মুহূর্তের স্তব্ধতার পর, হয়তো সেই মুহূর্ত কাহারও নিকট যুগান্তরের সামিল, তবু, নড়িয়া চড়িয়া বসে আলো ও ছায়া দেখিবার কেহ না-রহিলেও তাহাদের কিছু যায় আসে না...
...

সংশয়কেও এক রকম বিশ্বাস বলা চলে পথের নানান বিভক্তিতে, শাখা-প্রশাখায়, জাগিয়া উঠা ধন্দসে তো পথিকেরই নসিব! হোঁচট খাইতে খাইতে, নানান ঝঞ্ঝাটে পয়জার হইতে হইতে, যে তবু চলিতেছে, সে-ই তো পথিকসে জীবিতবা, অতিজীবিত টানিয়া নাহয় একটু লম্বা করা হইল তাহার জীবনকারণ মৃত্যুর বাস্তবতা তো সেই অনন্ত অবধি ছড়ানোআলোবছর জুড়িয়া শুধুই অন্ধকার অথচ কৃষ্ণ জাদুও বলা যায় না তাহাকে মৃত্যুর ভিতর তো কোনও বিস্ময় নাই, কোনও রহস্য নাই, একটি পাথরের টুকরার মতো এক নিরেট বাস্তবতা পরিব্যপ্ত, নিরঙ্কুশ এক বাস্তবতাযাহার দিকে তাকাইয়া ভয়ে থরথর করিয়া কাঁপিতে কাঁপিতে মানুষ ঈশ্বরের জন্ম দিল আর উলটা দিকে দাঁড়াইয়া ফিকফিক করিয়া হাসিতে থাকিল জীবন যে নিজেও তাহার কূলকিনারা পায় না চলিতেই থাকে, আর বদলাইতেই থাকে...

...

সম্পর্ক এক শৃঙ্খলযাহা রচিত হইতেও চায়, ভাঙিয়াও পড়ে তাই বলিয়া অসম্পর্কের ভিতর কি কোনও সংযোগ নাই! সেই পটলের কথা কি মনে রহিয়াছে আপনাদের, যাহার বাবা বাসচালক ছিলেন? না-থাকিলেই বা কী! স্মৃতিকে বিদায় জানাইতে পারিলেই বিস্মৃতির মহিমা গড়িয়া উঠে সেই তো আমাদের সোনার খনি সহসা কোন্ বুদ্বুদ ভুড়ভুড় করিয়া ভাসিয়া উঠিবে ফাটিয়া পড়িবে অদেখা রংধনুকের ঠমক একটি মায়াবী মধ্যাহ্নের খচিত ফলক হারমোনিয়াম বা, কৃত্তিবাস মাহাতর চুলায় বসানো হাঁড়ির উপর ঝরিয়া পড়া শাল-মহুয়ার রাত্রিচর আলোকেহই দাঁড়াইবে না গায়েব হইয়া যাইবে শূন্যে এখনকার মুহূর্তগুলিও কি সেইরূপই নয়! ইশারার উপর ফতোয়া দিতেছে কেউ কেহ দিতেছে অসমাপিকার উপরঅথচ সকলেই মুদ্রা অর্জন করিতে চাহে দোষে গুণে মুদ্রাও ইশারা...

...

এইফাঁকে এক গুহ্য কথা ফাঁস করা যাক নারীর গভীরতা পুরুষ কোথা হইতে পাইবে! সে ভাবে, সে অন্ধকারের দরোজা ভাঙিতেছে সে ভাবে, সে নিজেকে বিস্তারিত করতেছে কিন্তু তাহার তো সে-গভীরতা নাই এই আক্রোশে, ক্ষোভে, কামরার পর কামরায় বলপূর্বক প্রবেশ করিতে করিতে, একদিন সে ধর্ষক হইয়া উঠেএইভাবে পৃথিবীর আদিম কবিতাগুলি রচিত আর আগামী দিনের কবিতাগুলি পড়িয়া  আছে নারীর গর্ভে কারণ সে ধারণ করিতে পারে পুরুষ চাহিলেও যাহা পারিবে না চাহিলেও কিছুতেই আগামী দিনের কবিতা লিখা হইয়া উঠিবে না তাহার...

...

সেদিন সমুদ্রতীরের সভায় এক ময়ূরবাহন কব্জিতে-আঁটা ঘড়ি দেখাইয়া সগর্বে কহিলেনসময় এক বিমূর্ত ধারণা, এই বচন অতঃপর ভুলহয়তো তাঁহার প্রত্যয় এইরূপ যে, ঘড়ি আর সময় উভয়েরই মালিক তিনি তিনিই প্রস্তুতকর্তা, উভয়ের দূরে, দিগন্তের দিকে, নক্ষত্র হইতে ঝরিয়া-পড়া শিশির ধরিবে বলিয়া জাল বিছাইয়া বসিয়া আছে কিছু উদ্ধব কে তাহাদের কানে এই মন্ত্রণা দিল, আউলাইয়া দিল সকল রন্ধন! কে বাঁশি বাজাইল বড়াই? দুনিয়ার যে বড় বিপদ বাঁশিটি থামিতে দিও না...

...

সংগীত আর কোলাহল দুইই আসিয়া মিলিল এই প্রান্তরে মিলিল রৌদ্র আর ছায়া দিন আর রাত্রি নারী আর পুরুষ সকলেই অবনত মস্তকে ক্ষমাপ্রার্থী কিছু সকলেই উড্ডীন নিশানের ব্যঞ্জনায় উল্লসিত কিছু বেদনা ও আনন্দ আসিয়া মিলিতেছে তাই মিলিতেছে মন্ত্র আর নীরবতা এই মিলন কি এক অস্তিত্ববিলোপের লীলা, এ কি আত্মধ্বংস? এ কি ক্ষণিকের উন্মাদনা, না কি এক দীর্ঘলালিত স্বপ্ন? এইসব প্রশ্ন কোনও উত্তরের প্রত্যাশা করে না বস্তুত ইহাদের মীমাংসা অবান্তর...

একরাম আলি





খিদে

আচমকা তোমার হাসি— দমকা উচ্ছ্বাসে
তার হা-হা জানলাগুলো
উড়ে উড়ে আছড়ে পড়ছে মাথায়

সরে যে যাব, এই আকাশ থেকে কোন আকাশে?

লোলচর্ম জ্যোতিষ্কগুলি
আকাশের গর্তে গর্তে কুণ্ডলিত সরীসৃপ
মৃত্যুর আগে তাদের আধবোজা দৃষ্টি
মাটির মায়ায়
শেষবারের মতো জ্বলছে

সারা বিছানায় তাদের দগদগে ঘা, পুঁজ, রক্ত
বহু বিবর্তনের সালতারিখে শুকনো আর ঠান্ডা
তোমার স্তনের মতো
যা আসলে সেঁধিয়ে রেখেছ আঁচলের আগ্রাসনে

চৈতালী চট্টোপাধ্যায়






কবিতা ১

সংকেত জ্বলে আর নেভে।
জ্বললে, নতুন ইশারাটি।
নিভলে, ক্যালেন্ডারে প্রাণ
মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়ে।
আমি ধানশিষের কাহিনী খুব ভয়ে ভয়ে
লিখে থাকি।
আমি পেট-জ্বলে-ওঠা ছেলেকে,
সংকোচবশত লিখি,
যুদ্ধবিগ্রহ, অমনোযোগের রক্তপাত, সবই
লিখি, যেটুকু খবরের কাগজ দেয়!
না লিখলে, কবিতা সভ্যতা ছেড়ে
লাল বাতাসার মতো হরির লুঠের গায়ে
মিশে শুধু প্রেম দেবে—
যা আমি মায়ের পেট থেকে বের হয়ে
ইস্তক, মন পেতে, চেয়ে এসেছি।
প্রেতিনী, ডাইনি ও ভালোমানুষের ছেলেদের
চোখে  চোখ রেখে, চেয়ে এসেছি

কবিতা ২

আসলে সংকেত,
আসলে ইশারা,
আসলে তো কাজললতার মধ্যে  সংশয়
সাত-পা হেঁটে হেঁটে চলে, আর
শব্দ ও ছন্দের সেক্স হয়

রাজদীপ রায়






কলকাতা ক

নার্সারি স্কুলের দিকে গান গেয়ে চলেছে ছেলেটি
তার গানের ভেতর অকাল বসন্তে ঝরে যাওয়া
           কোনও ফুলের পুনর্জন্ম হয়...

আবারও মেঘ করে আসে...
রামধনু ঝুঁকে পড়ে পাড়ায় পাড়ায়...

সুর কেটে যায় বলে, মাঝে মাঝে তাকে সুগায়ক মনে হয়...

ওবায়েদ আকাশ




ঢুলি কমল : ফাঁসিমঞ্চে

ঢুলি কমলের চোখগুলো সভ্যতার বিস্ফারিত ভাষা

মেসোপটেমীয়, কারাল কিংবা মায়া সভ্যতার উদ্ভাবিত আলোয়
তার ঢোলের ব্যাঞ্জনা মহাকালিক সঙ্গীত রচনা করে

যে কোনো হ্রস্ব কিংবা ভীরু মানুষের বুকে
একবার আন্দোলিত হলে ভোরের মর্মর নাকি
অন্ধকারের মহাপ্রলয়ের তূর্য রচিত হয়—
                    এ-কথা জানে না কমল

কোলাহল থেমে গেলে— যখন নিতান্ত ঢোলের বাড়িতে
সভ্যতার একাল থেকে সেকাল প্রকম্পিত করে দেয় সে—
রাজদণ্ড ছুটে এসে দুহাতের কব্জি কেটে নদীতে ভাসিয়ে
দেয় গীত সমাহার। ঢুলির উদ্বেলিত রূপ একবার কেটে ফেলা হাত
আর একবার রাজলেখ্য ভর করে হেঁটে যায় ফাঁসিমঞ্চের প্রপঞ্চিত পটে

যমটুপি বিদ্ধ করে কতকালের পুরনো ফাঁসির রজ্জুতে দেখে
পৃথিবীর সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত কত কত রাজা ও রাজপ্রহরীর
কালো রক্তপুঁজ— কখনো ঘৃণায় কখনো প্রবল জিজ্ঞাসায় কালশিটে হয়ে আছে

সহাস্যে ফাঁসিমঞ্চে হেঁটে আসা কমল
সভ্যতার শানানো ছুরিটা নিজেই বসিয়ে দেয় নিজেকে হঠাৎ!
তার ছিটকে পড়া রক্তে নতুন কোনো সভ্যতার ভূভাগ রচিত হয়

রাজা নেই রক্ত নেই
প্রলম্বিত সবুজ উদ্যান জুড়ে মানুষ রয়েছে শুধু—
ভাষাগুলো চুরি হয়ে গেছে শতদল পাপড়ির ফোটায়

একঝলক

সম্পাদকীয়-র পরিবর্তে

এক আশ্রমে গুরু এবং তার শিষ্যরা যখন সান্ধ্যকালীন ধ্যান শুরু করে তখন সেখানে আশ্রিত বিড়াল খুব শব্দ করায় তাদের ধ্যানের ব্যাঘাত ঘটে। গুরু ত...

পছন্দের ক্রম